এই সপ্তাহে বাংলাদেশের খবরের কাগজ খুললে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় চোখ রাখলে যে কেউ একটু বিভ্রান্ত হতে পারেন। মনে হবে যেন রূপকথার রাজ্যে বাস করছি আমরা। একদিকে চাল-ডাল-সবজির দাম আকাশচুম্বী, অন্যদিকে উন্নয়নের ফিরিস্তি নিয়ে সরকারি মহলের হৈচৈ যেন কোনো বিশাল উৎসবের আমেজ দিচ্ছে। সাধারণ মানুষের পকেটের খবর আর সরকারি উন্নয়নের গল্পের মধ্যে যে বিশাল ফারাক তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে আজকের এই আলোচনার অবতারণা। চলুন দেখি, কীভাবে সবকিছু ঠিকঠাক থাকার পরেও সাধারণ মানুষের দিন কাটছে এক অদ্ভুত টেনশনের মধ্য দিয়ে। সত্যি বলতে, আজকের দিনে সাধারণ মানুষ যেন এক অদৃশ্য গোলকধাঁধায় আটকা পড়েছে, যেখানে উন্নয়নের ঝলকানি আছে, কিন্তু শান্তির ছোঁয়া নেই।
উন্নয়নের রকেটে চড়ে আকাশ দেখা
সরকার দাবি করছে দেশ উন্নয়নের রকেটে চড়ে বসেছে। রকেটের গতি এতই বেশি যে সাধারণ মানুষের চোখ তা ধরতে পারছে না। [INTERNAL_LINK: দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ] বাজারের কথা চিন্তা করুন। এক কেজি সবজির দাম যখন আপনার দুপুরের খাবারের খরচের চেয়ে বেশি হয়ে যায়, তখন বুঝতে হবে আপনি উন্নয়নের এক বিশেষ স্তরে আছেন। সরকার বলছে এগুলো সব বৈশ্বিক সমস্যা। মানে, সারা বিশ্ব যখন না খেয়ে আছে, আমাদের তখন উন্নয়নের নামে রাস্তা খুঁড়ে গর্ত করে রাখা হয়েছে। এই গর্তগুলো কিন্তু সাধারণ গর্ত নয়, এগুলো উন্নয়নের চিহ্ন। আপনি যদি সেই গর্তে পা পিছলে পড়ে যান, তবে বুঝতে হবে আপনি উন্নয়নের অংশীদার হতে চেয়েছেন কিন্তু পারেননি।
এই যে রকেট গতির উন্নয়ন, এটি আসলে আমাদের মধ্যবিত্ত জীবনের মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে। মাসের শুরুতে যখন বেতনের টাকা পকেটে আসে, সেই টাকা বাজারের ফর্দ মেটাতেই শেষ হয়ে যায়। এরপর বাড়ি ভাড়া, বাচ্চার স্কুলের বেতন আর সংসারের অন্যান্য বাড়তি খরচ। কোথায় যেন একটা হিসাব মিলছে না। সরকারের রকেট যখন আকাশে উড়ছে, তখন আমাদের সাধারণ মানুষের জীবন যেন মাটির গর্তে আটকা পড়ে আছে। এই রকেট কি আমাদের নিয়ে কোথাও পৌঁছাবে, নাকি কেবল ধোঁয়া আর শব্দই রেখে যাবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
জাদুকরী পরিসংখ্যানের খেলা
আমাদের সরকারি পরিসংখ্যানবিদদের দক্ষতা সত্যিই ঈর্ষণীয়। তারা যেভাবে শূন্য থেকে সংখ্যা বানিয়ে ফেলেন, তা দেখে জাদুকররাও লজ্জা পেতে পারেন। দেশে দারিদ্র্য কমে গেছে, বেকারত্ব নেই বললেই চলে, মানুষ এখন সোনার চামচ মুখে দিয়ে ঘুমাতে যায়—এমনই সব তথ্য আমাদের সামনে ছুড়ে দেওয়া হয়। অথচ পাশের বাসার চাচা যখন চাকরির জন্য হাহাকার করেন, তখন মনে হয় তিনি হয়তো অন্য কোনো দেশে বাস করছেন। [INTERNAL_LINK: বেকার সমস্যা] তথ্যের এই জাদুকরী খেলা আসলে সাধারণ মানুষের মনে এক অদ্ভুত অস্বস্তি তৈরি করে। সবাই জানে বাস্তবের সাথে এই তালিকার কোনো মিল নেই, তবুও আমরা এগুলো গিলতে বাধ্য হচ্ছি। কারণ, উন্নয়নের গল্পের চেয়ে বড় গল্প তো আর কিছু হতে পারে না!
আসলে সংখ্যাতত্ত্বের এই কারসাজি আমাদের হতাশাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। যখন শুনি মাথাপিছু আয় বেড়েছে, তখন নিজের পকেট পরীক্ষা করি। সেখানে তো সেই জীর্ণ দশাই বিরাজমান। পরিসংখ্যানের মারপ্যাঁচে সাধারণ মানুষের কষ্টগুলো অদৃশ্য হয়ে যায়। কোনো সরকারি নথিতে কি লেখা আছে, একজন বাবা যখন তার সন্তানের আবদার মেটাতে না পেরে চুপ করে থাকেন, সেই কষ্টের মূল্য কত? এই অংকের হিসেবে উন্নয়নের ফানুস যতই বড় হোক, ভেতরে বাতাস ছাড়া কিছু নেই। আমাদের দরকার বাস্তবতার প্রতিফলন, কোনো জাদুর দণ্ডের ছোঁয়া নয়।
রাস্তাঘাটের চিরস্থায়ী উন্নয়ন
রাস্তায় বের হলে মনে হয় আমরা কোনো এক মহাকাব্যিক নির্মাণযজ্ঞের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। গত পাঁচ বছর ধরে যে রাস্তাটি খুঁড়ে রাখা হয়েছে, তা হয়তো আরও পাঁচ বছর এমনটিই থাকবে। কারণ, উন্নয়ন তো আর রাতারাতি হয় না! কাজ শেষ হয়ে গেলে তো আর বাজেট পাওয়া যাবে না। তাই উন্নয়নের খাতিরে মাসের পর মাস রাস্তা বন্ধ রাখাটা এখন আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। যারা জ্যামে বসে ঘাম ঝরাচ্ছেন, তাদের আসলে সরকারের এই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার প্রশংসা করা উচিত। আপনি হয়তো দেরি করে অফিসে পৌঁছেছেন, কিন্তু ভাবুন তো, ওই রাস্তাটি না খুঁড়লে কি আপনি এই রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা পেতেন?
রাস্তাঘাটের এই অবস্থা দেখে মনে হয়, উন্নয়ন মানেই হচ্ছে ধুলোবালি আর জ্যাম। শহরের যান্ত্রিক জীবনে মানুষের সময়ের দাম অনেক, কিন্তু রাস্তা খোঁড়ার মহোৎসবে সেই সময় যেন স্রেফ গলে পড়ে। বৃষ্টি নামলে তো কথাই নেই, তখন রাস্তাগুলো হয়ে যায় খাল-বিল। ছোটখাটো নৌকা নামিয়ে দিলে হয়তো যাতায়াতটা আরও সহজ হতো। কিন্তু না, আমাদের উন্নয়নের নিয়মে কাদা-পানিতে হাবুডুবু খাওয়াটাই হচ্ছে নাগরিক জীবনের নতুন ‘অ্যাডভেঞ্চার’। এই অ্যাডভেঞ্চার আমাদের ধৈর্যের চূড়ান্ত পরীক্ষা নিচ্ছে প্রতিনিয়ত।
সবকিছুর দায়ভার বাতাসের ওপর
কোনো সমস্যা হলেই সরকার খুব সুন্দর করে সব দোষ বাতাসের ওপর, কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর চাপিয়ে দেয়। বিদ্যুৎ নেই? আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দাম বেড়েছে। জিনিসের দাম বেশি? ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব। সবকিছুর জন্য দায়ী যেন অন্য কেউ, সরকার তো কেবল শান্তির বার্তা নিয়ে বসে আছে। [INTERNAL_LINK: সুশাসন] এই যে দায়বদ্ধতার অভাব, এটাই কি আধুনিক রাজনীতির নতুন ধারা? সাধারণ মানুষ এখন আর কোনো প্রশ্নের উত্তর আশা করে না, তারা শুধু আশা করে যে আগামী মাসে হয়তো কোনো নতুন অজুহাত তৈরি হবে না। কিন্তু হায়, অজুহাত তৈরির কারখানাও যে উন্নয়নের রকেটের মতোই দ্রুতগতিতে চলছে!
দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার এই প্রবণতা দেশের মেরুদণ্ডহীন হওয়ার লক্ষণ। আপনি যখন শাসনক্ষমতায় আছেন, তখন ভালো-মন্দের দায়ভার তো আপনারই। সব দোষ অন্যের ঘাড়ে দিয়ে পার পাওয়া যায় ঠিকই, কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে যে ক্ষোভ দানা বাঁধছে, তা একসময় আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়তে পারে। অজুহাত দিয়ে পেট ভরে না, আর বিদ্যুৎহীন ঘরে উন্নয়নের গল্প শুনেও তৃপ্তি পাওয়া যায় না। সত্যকে স্বীকার করার সাহসই হতে পারে সমাধানের প্রথম ধাপ। কিন্তু সেই সাহস কি আমাদের কর্তাব্যক্তিদের আছে?
উপসংহার: উন্নয়নের নেশায় দিশেহারা
পরিশেষে বলতে হয়, এই উন্নয়ন আসলে কার জন্য, তা নিয়ে মনে নানা সংশয় রয়েই যায়। যে উন্নয়ন সাধারণ মানুষের দুবেলা ভাতের নিশ্চয়তা দিতে পারে না, যে উন্নয়ন মানুষের সম্মান নিয়ে প্রশ্ন তোলে, সেই উন্নয়নের দরকার কী? আমরা উন্নয়ন চাই, কিন্তু তা যেন হয় মানুষের জন্য, পরিসংখ্যানের জন্য নয়। সরকার যদি তাদের এই জাদুকরী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বেরিয়ে এসে বাস্তবের মাটিতে পা রাখে, তবেই হয়তো দেশের মানুষের সত্যিকারের দিন বদলাবে। ততদিন পর্যন্ত আমাদের হয়তো এই হাস্যরসাত্মক উন্নয়নের গল্পগুলো শুনেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে। আসুন, আশা করি আগামী সপ্তাহে হয়তো এমন কোনো খবর আসবে যা আমাদের মনে প্রকৃত স্বস্তি ফিরিয়ে আনবে, উন্নয়নের ফানুস উড়িয়ে নয়, বরং কাজের মাধ্যমে। মনে রাখবেন, দেশটা আমাদের সবার, তাই এর সঠিক উন্নয়ন দেখার অধিকারও আমাদের সবার আছে।