আজকাল আমাদের বিচারালয় আর সার্কাসের মঞ্চের মধ্যে খুব একটা পার্থক্য খুঁজে পাওয়া যায় না। রামিসার আলোচিত মামলার দিকে তাকালে সাধারণ মানুষের মনে হয়, যেন কোনো থিয়েটারের স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে। বিচার ব্যবস্থা যখন জটিল হতে হতে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছায় যে সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, স্বয়ং বিচারপতিও ঘাবড়ে যান, তখন সাধারণ নাগরিকদের মনে নানা প্রশ্ন জাগাই স্বাভাবিক। মানুষ ভাবে—আসলেই কি এখানে ন্যায়বিচার হচ্ছে, নাকি এটি নিছক লটারি খেলা? আজকের এই খোলামেলা আলোচনায় আমরা একদম সহজ ভাষায় বোঝার চেষ্টা করব কীভাবে রামিসার পুরো বিচার প্রক্রিয়াটি বর্তমানে একটি হাস্যকর ট্র্যাজেডিতে বা রূপকে পরিণত হয়েছে।
বিচারব্যবস্থার গোলকধাঁধা ও রামিসার গল্প
রামিসার ঘটনাটি যেন কোনো টানটান উত্তেজনার সিনেমার চিত্রনাট্য। [INTERNAL_LINK: আইনের শাসন] বিষয়টি আমরা স্কুল-কলেজের বইয়ে পড়েছি, কিন্তু বাস্তবের চিত্রটা যে এত বেশি রঙিন ও রহস্যময় হতে পারে, তা আগে জানা ছিল না। রামিসার বিরুদ্ধে যখন গুরুতর অভিযোগ এল, তখন সাধারণ মানুষের মনে আশা জেগেছিল যে বিচার বোধহয় দ্রুতই হবে। কিন্তু হায়! আমাদের আইনি মারপ্যাঁচ এতই শক্তিশালী আর গোলকধাঁধায় ভরা যে, সেখানে ন্যায়বিচার পথ হারিয়ে ফেলে। বিশেষ করে, সরকার পক্ষ যে পরিমাণ ঢিলেঢালা ভাব এবং উদাসীনতা দেখাচ্ছে, তাতে মনে হয় তারা রামিসাকে বিচার করছেন না, বরং কোনো এক অদৃশ্য কারণে তাকে আইনি ঝক্কি থেকে বাঁচানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। এমন দৃশ্য দেখে সাধারণ মানুষের হাসি পাওয়া ছাড়া আর উপায় কী থাকে? যখন বিচারের টেবিল থেকে সততার চেয়ে কৌশলের গন্ধ বেশি পাওয়া যায়, তখন সাধারণ মানুষ অসহায় হয়ে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কী করতে পারে?
পেশাদারী নাটক ও সরকারের নির্বিকার ভূমিকা
সরকার প্রায়ই বড় গলায় ঘোষণা দেয়, তারা দেশে আইনের শাসন ও নিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠা করতে বদ্ধপরিকর। [INTERNAL_LINK: সরকারি দায়বদ্ধতা] কিন্তু যখনই রামিসার মতো প্রভাবশালী বা আলোচিত কারও নাম মামলায় জড়িয়ে যায়, তখন সেই শাসন যেন গুটিসুটি মেরে কোনো এক অন্ধকার কোণে গিয়ে আশ্রয় নেয়। সরকারের মন্ত্রী বা দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা মিডিয়ার সামনে যেভাবে সাফাই গান, তাতে মনে হয় তারা রামিসার মামলার উকিল হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার অপেক্ষায় আছেন। বিচার প্রক্রিয়াকে দিনের পর দিন দীর্ঘায়িত করাটা যেন এখন এক ধরনের ‘পেশাদারী শিল্প’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যত বেশি দেরি হবে, সাধারণ মানুষের স্মৃতি থেকে ঘটনার ভয়াবহতা তত বেশি ম্লান হয়ে যাবে—এটাই কি কৌশলের মূল কথা? তাদের এই নির্বিকার ভঙ্গি দেখে মনে হয়, রামিসা যেন সরকারের কেউ খুব আপনজন বা অতি গুরুত্বপূর্ণ কেউ। অথচ সংবিধান বলে, আইনের চোখে সবাই সমান, কিন্তু রামিসার ক্ষেত্রে সেই সমতা যেন এক অদৃশ্য দেয়ালের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকে।
বিচারকের চেয়ার নাকি আসুবিধার আস্তানা?
বিচারক যখন মামলার রায় দিতে বসেন, তখন অনেক সময় দেখা যায় তিনি হাজারটা নথিপত্র উল্টেপাল্টে ঘামছেন। রামিসার মামলার ফাইলগুলো এতই বিশালাকার যে, সেগুলো খুললেই পুরোনো ধুলো ওড়ার শব্দ পাওয়া যায়। সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে, এই হাজার পাতার ফাইলে কি সত্যিই অপরাধের কোনো ठोस প্রমাণ আছে, নাকি শুধু কাগজের স্তূপ দিয়ে সময় পার করার এক নিপুণ কারসাজি? বিচারক সাহেব যখন বারবার তারিখ পিছিয়ে দেন, তখন দর্শক বা সাধারণ মানুষ ভাবেন—এটাই কি তবে বিচারের শেষ পরিণতি? একটার পর একটা তারিখ পার হওয়া আমাদের দেশের বিচার ব্যবস্থার যেন এক ঐতিহ্যবাহী রীতিতে পরিণত হয়েছে। [INTERNAL_LINK: ন্যায়বিচার পরিস্থিতি] আর এই অশুভ ঐতিহ্যের যেন অন্যতম ধারক ও বাহক হয়ে উঠেছেন রামিসা। যখন আইনের দীর্ঘসূত্রতা মানুষের ধৈর্যকে পরীক্ষা করে, তখন ন্যায়বিচার শব্দটা কেবল বইয়ের পৃষ্ঠাতেই শোভা পায়।
আইনের চশমায় রামিসা ও সাধারণ মানুষ
আইন নাকি সবার জন্য সমান? এই কথাটা শুনলে এখন সাধারণ মানুষের হাসি পায়। রামিসার জন্য যে গতিতে আইন চলে, সাধারণ মানুষের জন্য তা যেন উল্টো রথে চলে। রামিসার আইনজীবী যখন আদালতের বারান্দায় হাসাহাসি করে বের হন, তখন মুহূর্তেই বোঝা যায় বিচার কার দিকে ঝুঁকছে। আমাদের বিচার ব্যবস্থা যেন এক জাদুকরের বাক্স—যেখানে কবুতরের বদলে অপরাধী অদৃশ্য হয়ে যায়! সরকার চুপ, প্রশাসন অন্ধ, আর বিচার ব্যবস্থা যেন বধির। এই ত্রয়ী মিলে যে অদ্ভুত তামাশা তৈরি করেছে, তা বিশ্বমানের। রামিসার বিচার এখন আর কোনো আইনি সমস্যা নয়, এটি এখন আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক রসিকতার অন্যতম প্রধান উপকরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ জানে এখানে কী ঘটবে, আর ঠিক সেই নাটকটিই প্রতিদিন মঞ্চস্থ হয়।
ভাবুন তো, একটি সাধারণ চুরির মামলায় যে তৎপরতা দেখা যায়, রামিসার মতো বড় ঘটনায় কেন তার ছিটেফোঁটাও দেখা যায় না? এটি কি স্রেফ গাফিলতি, নাকি এর পেছনে কোনো গভীর পরিকল্পনা রয়েছে? আইনের মারপ্যাঁচে সাধারণ মানুষের জীবন বিপর্যস্ত হয়, কিন্তু রামিসার মতো প্রভাবশালীরা দিনের শেষে বীরদর্পে ঘুরে বেড়ায়। এই বৈষম্য কেবল আমাদের আইন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা নয়, বরং এটি আমাদের নৈতিক অবক্ষয়ের এক জ্বলন্ত নিদর্শন। সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার না পেলে কোথায় যাবে? এই প্রশ্নটি বারবার ফিরে আসে কিন্তু উত্তরের অভাবে তা বাতাসে মিলিয়ে যায়।
শেষ কথা: রামিসার বিচার কি আসলেই শেষ হবে?
পরিশেষে বলা যায়, রামিসার বিচার প্রক্রিয়াটি আমাদের দেশের বিচার ব্যবস্থার এক অশুভ প্রতিচ্ছবি ছাড়া আর কিছুই নয়। এখানে অপরাধী অপরাধ করেও রাজার হালে থাকে, আর সাধারণ মানুষ দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাকিয়ে থাকে। আমরা কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারি না এই মামলার শেষ কবে হবে, বা আদৌ কোনোদিন হবে কি না। হয়তো নতুন কোনো নাটক শুরু হলে আমরা রামিসার কথা ভুলে যাব, নতুন কোনো ইস্যুতে মেতে উঠব। কিন্তু মনে রাখা ভালো, ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। সরকার যতই চেষ্টাই করুক না কেন, জনগণের চোখের সামনে থেকে সত্য ঢেকে রাখা সম্ভব নয়। হয়তো কোনো একদিন বিচারব্যবস্থা তার আপন গতি খুঁজে পাবে, হয়তো একদিন আইন সত্যিকারের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে। তবে ততদিন পর্যন্ত আমাদের এই নাটকের দর্শক হয়েই থাকতে হবে। পরিশেষে বলতে চাই, বিচার যেন শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে, বাস্তবেও যেন তার প্রতিফলন দেখতে পাই—এইটুকুই আমাদের একমাত্র চাওয়া। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসাই এখন সময়ের বড় দাবি।